জীবনের প্রথম হানিমুনে এসে সানরাইজ দেখলে যে সানসেটটাও ইনএভিটেবলি নতুন বউকে দেখাতে হয়

আমার এটা জীবনের প্রথম ট্রেক। এর আগে পাহাড় বলতে ওই দার্জিলিং। ওই চিরাচরিত বাঙালিসুলভ ব্যাপার স্যাপার আর কী! প্রথমবার এত উঁচুতে এসেছি, তাও কিনা আবার হানিমুনে! গত মাসে আমার আর অরিজিৎ এর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর পরিকল্পনা ছিল হানিমুন করতে নৈনিতাল যাওয়ার। স্নিগ্ধ, নিরিবিলি, শান্ত জায়গা। সাতদিন আরাম করে কাটিয়ে আসাই যেত আর পাঁচটা গড়পড়তা বাঙালি ‘হানিমুন কাপল’ এর মতো! কিন্তু না, বাধ সাধল তালপাতার সেপাইরা! মানে, তালপাতার সেপাই এর গান শুনতে গিয়েই তো অরিজিৎ এর মাথায় ট্রেকিং এ যাওয়ার এই কিম্ভূত শখটা চাপল! ওখানে জ্যোতিষ্কর সাথে দেখা। জ্যোতিষ্ককে আমি এই প্রথমবার দেখলাম। আমাদের বিয়েতেও আসেনি। ও নাকি একটা ট্রেকিং কোম্পানি চালায়। Annapurna Base Camp ঘুরতে গিয়েছিল বলে বিয়েটা মিস করে গেছে। সেই জ্যোতিষ্কই মাথায় এই Sandakphu ট্রেকিং এর প্ল্যানটা ঢোকাল। রাতারাতি নৈনিতাল ক্যান্সেল করে, প্লেন, গাড়ি, পায়ে হেঁটে, খুঁড়িয়ে, হামাগুড়ি গিয়ে অবশেষে এসে পৌঁছেছি Sandakphu এই হোটেলে। প্রথমটায় অরিজিৎ এর ওপর বীভৎস রাগ হয়েছিল, ওর ওপর এমনিতেই আমার সবসময়ই রাগ হয়। ওই সাড়ে পাঁচ ফুটের ছেলেটাকে আমি বিয়ে করতেই চাইনি। নেহাতই বেইমান অনুজয় বেইমানি করতে গিয়ে আটাত্তর নম্বরবার ধরা পড়ল, তাই…যাইহোক। আগের সাতাত্তরবার ওর ছয়ফুট এক ইঞ্চি হাইটের জন্য ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। এবার আর করিনি। ইয়ার্কি পেয়ে গেছে…

তবে এটা ঠিক যে Sandakphu জায়গাটা সত্যিই চমৎকার, পশ্চিমবঙ্গের হাইয়েস্ট পয়েন্ট বলে কথা! এখান থেকে Everest দেখা যায়, জানেন? আর সঙ্গে Kanchenjunga ও! এছাড়াও Makalu, Nuptse, Lhotse…এইরকম সব অদ্ভুতমার্কা মিষ্টি নামের পাহাড়ে ঢাকা এই সান্দাকফু। এত্ত কাছ থেকে এমন সুন্দর আর পুরো বরফে মোড়া পাহাড় আমি আগে কখনো দেখিনি! এটা জীবনে প্রথম কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা। ছেলেটা পুরো ব্যোমকে গিয়েছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে। প্রচুর ছবি তুলেছে, জানেন? আপনাদেরকে দেখাব, দাঁড়ান।

ওহ, এখানে Tumbling বলে একটা ব্যাপক জায়গা আছে। Sandakphu আসার পথে পড়ে। অরিজিৎ আর আমি জীবনের সেরা সূর্যোদয় দেখেছি ওই Tumbling থেকে। মানে ভোররাতে, সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগে, ও আমাকে আধঘুমন্ত অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল সানরাইজ পয়েন্টে। দুর্দান্ত ঠাণ্ডা হাওয়ার যখন দাঁতকপাটি লেগে যাওয়ার জোগাড় হঠাৎ দেখি সামনে একটা আকাশজোড়া ডিমের কুসুম! টকটকে লালচে রঙের সূর্যের আলোয় চারপাশটা কেমন ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। না, এর কোনো ছবি আমরা ক্যামেরায় তুলিনি। এই দৃশ্য আমাদের দুজনের একান্ত ব্যক্তিগত। অপার্থিব ভালোবাসা, ভালোলাগার এক টুকরো মুহূর্ত..

এবার জীবনের প্রথম হানিমুনে এসে সানরাইজ দেখলে যে সানসেটটাও ইনএভিটেবলি নতুন বউকে দেখাতে হয়, এটা দেখলাম অরিজিৎ জানে! জীবনের প্রথম হানিমুন তো, ছেলের খুব উৎসাহ, বুঝলেন! এই সানরাইজ দেখাতে নিয়ে গেল সেই Tumbling এ, আবার Sandakphuথেকে খানিকটা দূরে নিয়ে গেল সানসেট দেখাতে। জায়গাটার নাম Aal। উফ্! কী জায়গা কী বলব মাইরি! মানে বিশেষণ-অ্যাডজেকটিভ এ ডেসক্রাইব করতে পারবনা। সরি! আচ্ছা, সমুদ্র মানেই জল, তাই তো? এবার ধরুন একটা মেঘের সমুদ্র, যার কোন শুরু বা শেষ নেই, চারিদিকে মেঘ ভাসছে, তার মাঝখানে পাহাড় উঁকিঝুঁকি মারছে, দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর এভারেস্ট চকচক করছে, আর তার মাঝখানে একটা লালচে গোলা আস্তে আস্তে মেঘের সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে। মানে, ম্যাটারটা বুঝতে পারছেন কী হচ্ছে? আহল আসলে একটা ফেয়ারি টেল, একটা সব পেয়েছির দেশ যাকে ইচ্ছে করলেই ছুঁয়ে আসা যায়।

সান্দাকফু থেকে ফিরে এসেছি দিন সাতেক হলো।অরিজিৎ এর আবার লঙ্কা ছাড়া আলুসেদ্ধ খাওয়া শুরু করেছে। মাঝেমধ্যে আজকাল গান গেয়ে শোনায়। অবশ্যই ‘বেলা চাও’ নয়! আবার পাহাড়ি স্টাইলে ম্যাগি রান্না করা শিখেছে। খেয়ে নেওয়া যায়। মানে, ওই ভালোর দিকেই হয় আর কী!
আজকাল নিয়ম করে ওর সাথে মর্নিং ওয়াকে বেরোই। স্ট্যামিনা বাড়াতে হবে বুঝলেন। পরের ট্রেকের প্রস্তুতি। Jyotishko কে বলে রেখেছি।

শিগগিরই ফিরে আসছি পরের ট্রেকের গল্প নিয়ে

আর আমি অরুন্ধতী

Scroll to Top